-------------------------- بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ --------------------------
সুপ্রিয় টেকটিউনস কমিউনিটি সবাইকে আমার সালাম এবং শুভেচ্ছা জানিয়ে শুরু করছি আমার আজকের টিউন।
ভাইরাস কথাটি একেক জনের কাছে একেক রকম মনে হয়। জীবনে প্রথম যেদিন কম্পিউটার ভাইরাস কথাটি শুনি সেদিন এক অজানা আসঙ্কায় আৎকে উঠিলাম। কারন আমি ক্লাস সিক্স, সেভেন, এইটে পড়া পর্যন্ত ভাইরাস বলতে জীববিজ্ঞানে পড়া এক ধরনের জীবানু বুঝতাম। আমার মনে আছে আমার এক কাজিন একদিন বললো কম্পিউটারে ভাইরাস আছে। আমি তো একথা শুনে ভয়ে অস্থির, ভাবলাম কম্পিউটার স্পর্শ করলেই সেই ভাইরাস আমাকে আক্রমন করবে। কিন্তু পরে জানলাম যে জীববিজ্ঞানের ভাইরাস এবং কম্পিউটারের ভাইরাস দুইটা ভিন্ন জিনিস। আসলে ভাইরাস হলো এমন এক ক্ষতিকর কম্পিউটার প্রোগ্রাম যা নিজে নিজে কপি হতে পারে এবং সমগ্র কম্পিউটারে ছড়িয়ে পড়ে আপনার কম্পিউটারের সফটওয়্যার এবং হার্ডওয়্যার উভয়ের ক্ষতি করতে পারে। আজকের টিউনে আমরা জানবো এমন কিছু কম্পিউটার ভাইরাস সম্পর্কে যারা জীববিজ্ঞানের ভাইরাসের তুলনায় কোন অংশে কম ক্ষতি করেনা।
I Love You কথাটা প্রত্যেক মানুষের জীবনের সাথে সমানভাবে যেমন ফেভার করেনা ঠিক তেমনি কম্পিউটারের জন্যও I Love You ভাইরাসটি ফেভারেবল হয়নি। এ যাবত কালে যতো কম্পিউটার ভাইরাস আছে তার মাঝে সব চেয়ে শক্তিশালি কম্পিউটার ভাইরাস হিসাবে চিহিৃত করা হয়েছে এই I Love You ভাইরাসটিকে। এই ভাইরাসটি যখন বিকাশ লাভ করে তখন খুব দ্রুত সারাবিশ্বের কম্পিউটারগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। পরিসংখ্যান মতে এই বিপদজনক কম্পিউটার ভাইরাস কর্তৃক ক্ষয়ক্ষতির পরিমান প্রায় ১০ – ১৫ বিলিয়ন ইউএস ডলার। ধারনা করা হয় বিশ্বে যতো কম্পিউটার আছে তার ১০% কম্পিউটার এই ভাইরাসটি দ্বারা আক্রান্ত হয়। সব চেয়ে মজার ব্যাপার হলো অধিকাংশ দেশের সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এই ভাইরাসের আক্রমন থেকে বাঁচার জন্য তাদের কম্পিউটার মেইলিং সিস্টেমকে অফলাইনে রাখতে বাধ্য হয়।
এই ভাইরাসটি সাধারনত ইমেইলের মাধ্যমে সংক্রামিত হতো। জানা যায় যে, কম্পিউটারের সাধারনত I Love You লেবেলের ইমেইল আসতো এবং সেটা নিজে নিজে মেইলের কন্টাক্ট লিস্টে থাকা সকল মেইলে একই রকম মেইল পাঠাতে পারতো। সেই সাথে এটা উক্ত মেইলের ইউজার নেইম এবং পাসওয়ার্ড হ্যাকারের কাছে পাঠাতো। এই বিধ্বংসী কম্পিউটার ভাইরাসটি তৈরী করেন ফিলিপাইনের প্রোগ্রামার Reonel Ramones এবং Onel de Guzman। তাদের এই প্রোগ্রাম যখন মেইলের এটাচমেন্ট হিসাবে কারো ইনবক্সে আসতো তখন কেউ যদি এটাতে ক্লিক করতো তখন একটি স্ক্রিপ্ট রান হতো যার মধ্যে একটি টেক্সট ফাইল থাকতো। এটা মেইলের তথ্য চুরি করার পাশাপাশি কম্পিউটারকে আনবুটেবল করতো। মজার ব্যাপার হলো এই দুজন হ্যাকারকে এর জন্য কোনরূপ শাস্তি ভোগ করতে হয়নি কারন তখন এর বিরূদ্ধে কোন আইন ছিলো না।
এই ভাইরাসটি প্রথম প্রকাশ পায় ১৩ জুলাই ২০০১ সালে এবং এটাকে শনাক্ত করে eEye Digital Security কোম্পানির দুজন কর্মচারী। মজার ব্যাপার হলো এই ভাইরাসটির নামকরন নিয়ে সুন্দর এবং ছোট্ট একটি গল্প আছে। যখন কর্মচারী দুজন এই ভাইরাসটি শনাক্ত করে তখন তারা Code Red Mountain Dew পান করছিলেন, একারনে ভাইরাসটির নামকরন করা হয় Code Red। এই ভাইরাসটি কম্পিউটারে ইনস্টল থাকা Microsoft IIS web server আক্রমন করে সিস্টেমে মারাত্বক সমস্যার সৃষ্টি করে। এই ভাইরাসটি যদি একবার কোন কোন সার্ভার কে আক্রমন করে তাহলে এটা একবারে প্রায় ১০০টার মতো নিজের প্রতিরূপ (কপি) সৃষ্টি করে, এবং সব শেষে আপনার সিস্টেমে থাকা সকল রিসোর্স খেয়ে ফেলে। বলা হয়ে থাকে এটা যদি একবার আপনার সমগ্র মেমোরি ভিজিট করতে পারে তাহলে শুধু মাত্র সিস্টেমে ৩.৫কিলোবাইট ডাটা অবশিষ্ট থাকবে।
এই ভাইরাসটি হোয়াইট হাউস সার্ভারসহ অনেক আইপি এড্রেস এ্যাটাক করেছে। এটা সার্ভারে এমন এক ব্যবস্থার সৃষ্টি করে যার যাহায্যে দূরে থেকেও সেই মেশিনকে নিয়ন্ত্রন করা যায়। এটা যখন কোন ওয়েব সার্ভারকে আক্রমন করে তখন তার ওয়েব পেইজে যে মেসেজটি রেখে আসে সেটা হলো, Hacked By Chinese! এটা প্রায় ২.৬ বিলিয়ন ইউএস ডলার ক্ষতির কারন হয় এবং এই ভাইরাস প্রায় ১-২ মিলিয়ন সার্ভারকে এ্যাটাক করে। আপনি শুনলে আশ্চর্য হবেন যে বর্তমান বিশ্বে মাত্র ৬ মিলিয়ন Microsoft IIS web server সার্ভার আছে।
ভাইরাসটির নামটি শুনলেই কেন জানি চোখের সামনে একজন সুন্দরী নারীর মুখচ্ছবি ভেসে উঠে। এর পেছনে অবশ্য যৌক্তিক কারনও আছে। ভাইরাসটির নাম করন করা হয় ফ্লোরিডার একজন চমৎকার নৃত্য শিল্পীর নাম অনুসারে। এই ভাইরাসটি যে কুখ্যাত বা বিখ্যাত লোকটি তৈরী করেছেন তার নাম David L. Smith যিনি ১৯৯৯ সালে এই বিধ্বংসী ভাইরাসটি তৈরী করেন। এই ভাইরাসটি তার কর্ম শুরু একটি একটি আক্রান্ত ওয়ার্ড ফাইলের সাহায্যে যেটিকে পোস্ট করা হয় একটি নগ্ন চলচিত্রের গ্রুপে, শুধুমাত্র এই উদ্দেশ্যে যে এটি নগ্ন চলচিত্রের সাইটগুলোর পাসওয়ার্ড লিস্ট চুরি করতে পারবে। কিন্তু যারা আগ্রহ বসে এই ফাইলটি ডাউনলোড করে ওপেন করেছে তাদের কম্পিউটার ভাইরাসটি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। ভাইরাসটি কম্পিউটারগুলোর মেইল লিস্টে থাকা টপ ৫০টি মেইল এড্রেসে নিজে থেকেই মেইল পাঠাতে সক্ষম হয়। এর ফলে মেইল ট্রাফিক বেড়ে যায় এবং সরকারী ইমেইল সার্ভিসগুলো বিপাকে পড়ে।
জনাব স্মিথকে তার তৈরী করা ওয়ার্ড ডকুমেন্টের সাহায্যেই শনাক্ত করা হয়। ভাইরাস তৈরীর ১ সপ্তাহের মাঝেই স্মিথ সাহেব কে পাকড়াও করা হলে তিনি ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) কে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দেন যার সাহায্যে অন্যন্য হ্যাকারদেরকেও শনাক্ত করা যায়। তার এই সহযোগিতার কারনে তাকে মাত্র ২০ মাস হাজত বাসের পরেই মুক্ত করে দেওয়া হয়। শুধুমাত্র তার পরবর্তি ১০ বছরের দণ্ডের পরিবর্তে ৫০০০ ইউএস ডলার জরিমানা গুনতে হয়। এই ভাইরাসটি দ্বারা ক্ষয়ক্ষতির পরিমান প্রায় ৮০ মিলিয়ন ইউএস ডলার।
উইন্ডোজ এক্সপি যারা ব্যবহার করেন তারা হয়তো এখনো এই ভাইরাসটির সাথে পরিচিত। মজার ব্যাপার হলো আমাদের ক্লাস রুমের প্রজেক্টরের সাথে যে কম্পিউটারের সংযোগ আছে সেটাতেও এই ভাইরাস আছে। কিন্তু আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে গেলে স্যাররা অহেতুক কথা শুনাবে জেনে বলা হয় না। যাহোক, এই ভাইরাসটি সর্বপ্রথম আত্বপ্রকাশ করে ২০০৪ সালে। কম্পিউটার সায়েন্সের একজন ধূর্ত ছাত্র Sven Jaschan এই ভাইরাসটি আবিষ্কার করেন। এই ব্যাটা শুধু এই ভাইরাসটিই নয় পরবর্তিতে Netsky নামে আরো একটি ভাইরাস তৈরী করেন। এই ভাইরাসটি যখন কোন কম্পিউটারকে আক্রমন করে তখন অধিকাংশ সময় এটা সিস্টেম ক্র্যাশ করার কারন হয়ে দাড়ায়। তারপরেও এই ভাইরাসটি দ্বারা আক্রান্ত কোন কম্পিউটারে যদি ইন্টারনেট কানেকশন দেওয়া থাকে তাহলে সে হোস্টেড পিসি থেকে অন্য পিসিতে ডাটা ট্রান্সফার করে। এবং উক্ত পিসিও আক্রান্ত করে ফেলে।
যে সমস্ত কম্পিউটার খুব বেশি বা কখনো আপডেট দেওয়া হয়না সেগুলোতে এই ভাইরাসের সংক্রমন অনেক বেশি। মাইক্রোসফট তাদের উইন্ডোজ এক্সপি আপডেট বন্ধ করে দেওয়ার পরে এই ভাইরাসটি দ্বারা আক্রান্তের সংখ্যা দাড়িয়েছে এক মিলিয়নের কিছুটা বেশি। এবং এই ভাইরাসটি কর্তৃক ক্ষয়ক্ষতির পরিমান প্রায় ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই অপকর্মের হোতা Sven Jaschan কে তার কৃতকাজের জন্য ২১ মাসের সাসপেনশন দেওয়া হয়।
এই ভাইরাসটি মুলত অপকর্মের জন্য তৈরী করা হয়েছিলো। আগের তৈরী করা ভাইরাসগুলো ছিলো মানুষের ক্ষতি করার জন্য কিন্তু এই ভাইরাসটি অন্যের ক্ষতি করার পাশাপাশি হ্যাকারকে লাভবান করেছে। ২০০৯ সাল থেকে মুলত এই ক্ষতিকর ভাইরাসটি তার বিধ্বংসী কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এটা মুলত ইউজারের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করতে ব্যবহৃত হয়। সাধারন ইউজারের ব্যাংক একাউন্ট, সোস্যাল একাউন্ট সহ অন্যন্য একাউন্ট হ্যাক করতে এটি কাজ করে। সাধারনত এটা বিভিন্ন এফটিপি সার্ভার আক্রমন করে থাকে। ব্যবহার কারীর ফর্ম এবং ইনপুট সমূহ চুরি করে।
শুধুমাত্র অ্যামেরিকাতেই এটি প্রায় ১মিলিয়ন কম্পিউটারকে আক্রমন করেছিলো যা ছিলো সেই সময়ের মোট কম্পিউটারের ২৫%। হ্যাকাররা প্রায় ৭০ মিলিয়ন ইউএস ডলার চুরি এই ভাইরাসের মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছিলো। এই অপরাধের জন্য প্রায় ১০০ জনের মতো হ্যাকারকে গ্রেফতার করা হয়। ২০১০ সালে এই ভাইরাসের সৃষ্টিকর্তা এটা বন্ধের ঘোষনা দেয়। কিন্তু এখনো অনেকেই বিশ্বাস করে যে তার সেই ঘোষনাটি মিথ্যা। কারন এখনো মানুষ এর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে চলেছে। কম্পিউটারের দশটি বিধ্বংসী ভাইরাস নিয়ে আমার দুই পর্বের টিউনের প্রথম পর্ব এখানেই শেষ হলো। দ্বিতীয় পর্ব দেখতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন।
টিউনটি যদি আপনাদের ভালো লেগে থাকে অথবা বুঝতে যদি কোন রকম সমস্যা হয় তাহলে আমাকে টিউমেন্টের মাধ্যমে জানাতে ভুলবেন না। কারন আপনাদের যেকোন মতামত আমাকে সংশোধিত হতে এবং আরো ভালো মানের টিউন করতে উৎসাহিত করবে। সর্বশেষ যে কথাটি বলবো সেটা হলো, আসুন আমরা কপি পেস্ট করা বর্জন করি এবং অপরকেও কপি পেস্ট টিউন করতে নিরুৎসাহিত করি। সবার সর্বাঙ্গিন মঙ্গল কামনা করে আজ এখানেই শেষ করছি। দেখা হবে আগামী টিউনে।
আপনাদের সাহায্যার্থে আমি আছি........
ফেসবুক | টুইটার | গুগল-প্লাস
আমি সানিম মাহবীর ফাহাদ। সুপ্রিম টিউনার, টেকটিউনস, ঢাকা। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সৌশল নেটওয়ার্ক - টেকটিউনস এ আমি 11 বছর 11 মাস যাবৎ যুক্ত আছি। টেকটিউনস আমি এ পর্যন্ত 176 টি টিউন ও 3500 টি টিউমেন্ট করেছি। টেকটিউনসে আমার 159 ফলোয়ার আছে এবং আমি টেকটিউনসে 0 টিউনারকে ফলো করি।
আগে যা শিখেছিলাম এখন তা শেখানোর কাজ করছি। পেশায় একজন শিক্ষক, তবে মনে প্রাণে টেকনোলজির ছাত্র। সবার দোয়া প্রত্যাশি।
অসাধারণ লিখছেন ভাই 🙂
অনেক কিছু জানলাম শিখলাম…